মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৫ অপরাহ্ন

১৪৫ বছরের বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান, ছাদে ফাটল

ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি:: ১৪৫ বছরের পুরোনো ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বগুড়া ইউনিয়নের নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বয়স বেড়েছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত চিত্র। সময়ের সঙ্গে ভবন হয়েছে আরও জীর্ণ, বেড়েছে ঝুঁকি। কোথাও ছাদে ফাটল, কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা। দেয়াল থেকে বেরিয়ে পড়েছে রড, ভেঙে গেছে দরজা-জানালা। বৃষ্টির পানি ঠেকাতে ছাদে বিছিয়ে রাখতে হয় পলিথিন। তাতেও শেষ রক্ষা হয় না। পানি পড়ে ভিজে যায় শিক্ষার্থীদের বই খাতা, জামাকাপড়। এভাবেই ঝুঁকি আর আতঙ্ককে সঙ্গী করে ক্লাস করছে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বগুড়া ইউনিয়নের নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী।

শুধু বৃষ্টি নয়, তীব্র গরমেও অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। কোথাও ছাদ থেকে বালি-খোয়া খসে পড়ে, কোথাও দেয়ালের ইট খুলে পড়ছে। যেকোনো সময় ভবনের কোনো অংশ ধসে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা নিয়েই চলছে পাঠদান। বিদ্যালয়টিতে রুম সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় স্টোররুমেও পাঠদান করাতে হচ্ছে শিক্ষকদের। ভাঙা বোর্ড থাকায় ক্লাস নিতে ও লিখতে সমস্যায় পড়তে হয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। বিদ্যালয়ের মাঠেও জমে থাকে পানি। ফলে বন্ধ থাকে খেলাধুলা, এমনকি অনেক সময় নিয়মিত এসেম্বলিও করা যায় না। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরাও।

স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক সময় সন্তানদের বিদ্যালয়ে যেতে নিষেধ করেন তারা। ভয়ে অনেকে স্কুলে আসতেও চায় না। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৮৮১ সালে ৭৪ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নাগেরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ১৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো একাডেমিক ভবন বরাদ্দ পায়নি প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৮০ সালে একটি বিজ্ঞান ভবন এবং ১৯৯৭ সালে ফ্যাসিলিটিজ বিভাগ থেকে আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হয়। দীর্ঘদিনের ব্যবহারে সেই ভবন দুটিও এখন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নতুন ভবনের জন্য শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে একাধিকবার আবেদন করা হলেও এখনো মেলেনি স্থায়ী সমাধান।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ে পাঠদান কক্ষ, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, সহকারী শিক্ষকদের কক্ষ ও অফিসসহ মোট ১১টি কক্ষ রয়েছে। তবে অধিকাংশ কক্ষেরই বেহাল দশা। দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও বেরিয়ে পড়েছে রড। পুরোনো টিনশেড ঘরটির অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, দেয়ালের ইট খসে পড়ছে। ফলে যেকোনো সময় সেটিও ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ পরিবেশ তাদের পড়াশোনায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বৃষ্টিতে শ্রেণিকক্ষে পানি, গরমে টিনের চালার উত্তাপ, মাঠে জলাবদ্ধতা আর ভবন ধসের আতঙ্ক মিলিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষার্থী সেজুতি বলেন, আমরা অনেক ঝুঁকি আর ভয় নিয়ে ক্লাস করি। মাঝে মাঝে ছাদ থেকে বালি-খোয়া পড়ে শরীরে। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। অন্যদের বিদ্যালয় কত সুন্দর,আর আমাদের বিদ্যালয়ের অবস্থা খুব খারাপ। আমরা নিরাপদ ভবন চাই।

ফেরদৌসী খাতুন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের বিদ্যালয়টি অনেক পুরোনো। কিন্তু এখনো ভালো ভবন নেই। বোর্ড ভাঙা থাকায় লিখতেও সমস্যা হয়। আমরা চাই দ্রুত বিদ্যালয়ের নতুন ভবন করা হোক।

শিক্ষার্থীর অভিভাবক রানা হাসান বলেন, ১৪৫ বছরের বিদ্যালয়টির অবস্থা খুবই খারাপ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস করছে। নতুন ভবন এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত ভবন নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন,শুধু একটি নতুন ভবন নির্মাণ করলেই দীর্ঘদিনের সব সংকটের সমাধান হবে না। ১৪৫ বছরের পুরোনো এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি জাতীয়করণের দাবিও রয়েছে তাদের।

শিক্ষক প্রদীপ মন্ডল বলেন, এই বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু অবকাঠামোগত সংকটের কারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আমরা দ্রুত নতুন একাডেমিক ভবন চাই। পাশাপাশি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষা কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত হবে।

আরেক শিক্ষক সুমন রানা বলেন, ১৪৫ বছরের পুরোনো প্রতিষ্ঠান হয়েও এখনো আমাদের অনেক মৌলিক সংকট রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নিতে হয়। রুমের অভাবে স্টোররুমেও পাঠদান করতে হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত নতুন ভবনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানাই।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুকুল হোসেন বলেন, অনেক আগে থেকেই টিনশেড ঘরসহ ভবন দুটি ঝুঁকিপূর্ণ। একটি একাডেমিক ভবনের জন্য দীর্ঘদিন বিভিন্ন মহলে আবেদন করেও কোনো লাভ হয়নি। বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি। টিনশেড ঘরটিও যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। বিদ্যালয়ে নতুন ভবন বরাদ্দ এখন অত্যন্ত জরুরি।

তিনি আরও বলেন,বিদ্যালয়টি ১৪৫ বছরের পুরোনো। দীর্ঘদিন ধরে এখানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

ঝিনাইদহ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমান বলেন, যে সমস্ত বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ আছে সেগুলো আমাদের নজরে আছে। ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রী মো.আসাদুজ্জামান এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। আশা করছি অতিদ্রুতই বিদ্যালয়ের ঝুুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর স্থানে নতুন ভবন তৈরি হবে।

 

‎
‎
‎

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com